ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি ব্যাটারি কারখানার কার্যক্রম নিয়ে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ উঠেছে। জামিরদিয়ার পাড়াগাঁও এলাকায় অবস্থিত ‘ওয়ান শিয়াং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারখানার কয়েকটি উৎপাদন এলাকায় আংশিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।
ডিআইএফই সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১০ মে লিখিত আদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে বিভিন্ন অনিয়ম সংশোধনের জন্য একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ময়মনসিংহের শ্রম পরিদর্শক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বিধি লঙ্ঘনের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শ্রম আইনে মামলাও করা হয়েছে। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় কারখানার নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ডিআইএফইর নির্দেশনায় কারখানার সিসার প্লেট কাস্টিং, ওয়েল্ডিং, অক্সাইড উৎপাদন, চার্জিং, ফিনিশিং ও অ্যাসেম্বলি, সীসা রিসাইক্লিং এবং সীসা গলানো বা বার্নারযুক্ত সীসা উৎপাদন এলাকায় কার্যক্রম ও জনবল নিয়োগ বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

বিষাক্ত ধোঁয়া নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কারখানা থেকে বের হওয়া সীসাযুক্ত ধোঁয়া ও গন্ধের কারণে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এতে শ্বাস নিতে কষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ময়মনসিংহ নগরীর নাসিরাবাদ কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস অভিযোগ করেন, কারখানার সীসার গন্ধে স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হলেও এখনো প্রত্যাশিত প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে তাঁর দাবি।
হবিরবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, জনবহুল এলাকায় এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, কারখানার ধোঁয়া ও সীসার গন্ধে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। পাশাপাশি গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদনে সমস্যা হওয়ার কথাও জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা
কারখানাটির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ডিআইএফইর পরিদর্শনে কয়েকটি জেনারেটর ও বয়লার ইউনিট অগ্নিপ্রতিরোধী পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছাড়াই অস্থায়ী টিনের শেডে স্থাপনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ ছাড়া উন্মুক্ত মেইন ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড, অরক্ষিত বৈদ্যুতিক তার, থার্মাল টেস্টিংয়ের রেকর্ড না থাকা, আর্থিং সার্টিফিকেটের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার মতো ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের মতে, এসব ত্রুটি যথাযথভাবে সংশোধন না করা হলে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বড় ধরনের হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক মো. রাকিব জানান, প্রতিষ্ঠানটির এখনো ফায়ার লাইসেন্স অনুমোদন হয়নি। লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হলেও পরিদর্শনে বেশ কিছু অগ্নিনিরাপত্তা ঘাটতি পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রথমে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে এবং লিখিতভাবে নির্দেশনা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েও প্রশ্ন
ময়মনসিংহ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূর কুতুবে আলম সিদ্দিক জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি পরিদর্শন করে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে অধিদপ্তর।
তিনি জানান, প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে জরিমানার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়পত্র পেয়েছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলে স্থানীয় কার্যালয়ের সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমিত থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কারখানা বন্ধে এখতিয়ারগত জটিলতা
ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ করার এখতিয়ার উপজেলা প্রশাসনের নেই। এ ছাড়া শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কারখানাটি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে ডিআইএফই ময়মনসিংহের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিআইজি) আহমাদ মাসুদ জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মীদের আইডি কার্ড তৈরি করাসহ কিছু বিষয়ে বিধি মেনে কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে। পুনরায় পরিদর্শনের মাধ্যমে এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তা যাচাই করা হবে।
জনবহুল এলাকা থেকে সরানোর দাবি
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. ফখর উদ্দিন বাচ্চু জানিয়েছেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে জনবহুল এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলেছেন। নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
কারখানাটির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিনিধির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় কেয়ারটেকার ও জমির মালিক মো. জাকির হোসেন বলেন, তিনি শুধু জমি ভাড়া দিয়েছেন; কারখানা পরিচালনার নিয়মকানুন সম্পর্কে বিস্তারিত তাঁর জানা নেই।
২০১৫ সালে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত ওয়ান শিয়াং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক ও বৈদ্যুতিক রিকশার জন্য ডিপসাইকেল ব্যাটারি উৎপাদন ও বাজারজাত করে।
কারখানাটির উৎপাদন, পরিবেশগত প্রভাব, অগ্নিনিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *