রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে সাজেকে বেড়াতে আসা ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক সাময়িকভাবে আটকা পড়েন। পরে তাঁদের বিশেষ নিরাপত্তায় খাগড়াছড়ির দিকে পাঠানো হয়। পর্যটকদের কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাঘাইছড়ির উজোবাজার এলাকায় সাজেক সড়কের অবরোধ সরানোর চেষ্টা ঘিরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি যৌথভাবে আবারও অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আন্দোলনকারীরা উজোবাজার এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করেন।
সকালে সাজেকে আটকে থাকা পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সড়কের ব্যারিকেড সরানোর উদ্যোগ নেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে প্রথমে ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, তাঁরা তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত ছিলেন। পরে বিস্তারিত জানাবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রশাসনের নির্দেশে বন্ধ সাজেক পর্যটনকেন্দ্র
এর আগে বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর জারি করা জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সাজেক ভ্যালির পর্যটন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা না করা পর্যন্ত অবরোধ চলবে।
তবে জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী যান, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী গাড়ি, সংবাদপত্র বহনকারী যান এবং সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের গাড়িকে অবরোধের আওতামুক্ত রাখার কথা জানানো হয়।
কেন অবরোধ করছেন স্থানীয় সংগঠন দুটি
সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির দাবি, এলাকায় সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতা বন্ধ, সাধারণ মানুষকে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রতিবাদ এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে তারা কর্মসূচি পালন করছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার দাবিও জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া কোনো পক্ষের দায় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বারবার বন্ধ হচ্ছে পর্যটন কার্যক্রম
সাজেক রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কটেজ, হোটেল-মোটেল, পরিবহনসেবা, খাবারের দোকান এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির নানা ব্যবসা।
কিন্তু সড়ক অবরোধ ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে পর্যটনকেন্দ্রটি বারবার বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এর আগে ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ডাকে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। তখন পর্যটকদের ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে দুই দিন কর্মসূচি স্থগিত রাখার পর ১৫ অক্টোবর আবার অবরোধ পালিত হয়। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতি সম্মান জানিয়ে সংগঠন দুটি ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখে। এরপর নতুন করে অবরোধ শুরু হলে বৃহস্পতিবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সাজেকের পরিস্থিতি ঘিরে পর্যটকদের নিরাপত্তা, সড়ক যোগাযোগ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ রাখার প্রশাসনিক নির্দেশ বহাল রয়েছে কি না, সে বিষয়ে ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া জরুরি।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *