বাংলাদেশের সবচেয়ে কমসংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রচলিত স্বতন্ত্র ভাষাগুলোর একটি রেংমিটচা। বান্দরবানের আলীকদমের ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে একসময় ভাষাটির ব্যবহার ছিল। কিন্তু মহামারি, জনবসতি উচ্ছেদ, সামাজিক মিশ্রণ এবং পারিবারিক চর্চা কমে যাওয়ায় ভাষাটি এখন বিলুপ্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে।
সাম্প্রতিক সময়ে রেংমিটচা ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারা মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র দুজনে। তাঁরা সম্পর্কে দুই ভাই। তবে ভাষাটি বোঝেন কিংবা ভাঙা ভাঙা বা সীমিতভাবে বলতে পারেন—এমন আরও কয়েকজন এখনো জীবিত রয়েছেন।
এক ভাইয়ের মৃত্যুতে আরও সংকুচিত হলো ভাষার পরিসর
আলীকদমের কয়েকটি পাড়ায় একসময় রেংমিটচা ভাষা জানা প্রায় ১০ জন মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের তিন ভাই এই ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন।
গত ৫ মে ওই তিন ভাইয়ের একজন মাংওয়াই ম্রো ৬৬ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর সাবলীল বক্তার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে দুইজনে। তাঁরা হলেন মাংপুং ম্রো ও রেংপুং ম্রো। একজনের বয়স ৭৪ বছর এবং অন্যজনের ৭০ বছর।
তাঁরা বর্তমানে আলাদা দুটি ম্রোভাষী পাড়ায় বসবাস করেন। ফলে নিয়মিত রেংমিটচা ভাষায় কথা বলার সুযোগও খুব সীমিত।
মাংওয়াই ম্রোর ভাইয়ের ছেলে সিংরা ম্রো নিজেও রেংমিটচা ভাষা জানেন। তবে তিনি সাবলীলভাবে বলতে পারেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা ও চাচাই এখন এই ভাষার প্রধান সাবলীল বক্তা।
গবেষণায় জীবিত ভাষাজ্ঞানীদের সংখ্যা নয়
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে রেংমিটচা ভাষা নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন আফসানা ফেরদৌস। তাঁর মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে মোট নয়জন জীবিত ব্যক্তি কোনো না কোনো মাত্রায় রেংমিটচা ভাষা জানেন।
তাঁদের মধ্যে দুজন সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। তিনজন ভাঙা ভাঙা ভাষাটি বলতে পারেন এবং আরও চারজন মোটামুটি ভাষাটি জানেন।
গবেষকের তথ্য অনুযায়ী, কুনরাও নামের দুই বোন—যাঁদের বয়স ৬২ ও ৬৫ বছর—রেংমিটচা ভাষা ভাঙা ভাঙা বলতে পারেন। তাঁরা আলীকদমের ক্রাংসিপাড়ায় থাকেন। একই পাড়ায় সাবলীল বক্তা মাংপুং ম্রোও বসবাস করেন। আরেকজন অর্ধভাষী থোয়াইনলক ম্রো থাকেন মেনসিংপাড়ায়।
তবে এই মানুষগুলো একই পরিবারের সদস্য নন। ফলে পারিবারিক কথোপকথনের মাধ্যমে ভাষাটি নতুন প্রজন্মে পৌঁছানোর সুযোগ প্রায় নেই।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াই বড় সংকট
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, একটি ভাষা টিকে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো পরিবারের মধ্যে নিয়মিত তার ব্যবহার। শিশু-কিশোরেরা পরিবার থেকেই প্রথম ভাষা শেখে। কিন্তু রেংমিটচা ভাষাভাষী পরিবারগুলো ভেঙে গিয়ে ম্রোভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
রেংমিটচা জানা ব্যক্তিরাও নিজেদের পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মূলত ম্রো ভাষায় কথা বলেন। কারণ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য রেংমিটচা বোঝেন না। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাটি শেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
গবেষক আফসানা ফেরদৌস বলেন, পারিবারিক চর্চা না থাকায় রেংমিটচা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ভাষাটিকে বাঁচাতে শিশু-কিশোরদের পূর্বপুরুষের ভাষা শেখার প্রতি উৎসাহিত করা, ভাষার লিপি উদ্ভাবন, শব্দভান্ডার সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং পারিবারিক ব্যবহারে ভাষাটিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন।
মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়েছিল রেংমিটচা জনগোষ্ঠী
স্থানীয় রেংমিটচাভাষী ও ম্রোদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে এবং পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে রেংমিটচা অধ্যুষিত এলাকায় গুটিবসন্ত ও কলেরার মতো ভয়াবহ রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন সময়ের মহামারিতে রেংমিটচা জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যান। বনসুপাড়া, কুইকিপাড়া, রানিপাড়াসহ বেশ কয়েকটি রেংমিটচা পাড়া জনশূন্য বা উচ্ছেদ হয়ে যায়।
আগেই ছোট জনসংখ্যার এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মহামারির কারণে আরও ব্যাপকভাবে কমে যায়। ফলে অনেক রেংমিটচাভাষী মানুষ বাধ্য হয়ে ম্রোভাষী পাড়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে ম্রো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্কও বাড়তে থাকে।
এভাবেই ধীরে ধীরে রেংমিটচা ভাষাভাষীরা বৃহত্তর ম্রো সমাজের সঙ্গে মিশে যান এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে ম্রো ভাষার ব্যবহার বাড়তে থাকে।
১৯৮০-এর দশকের অস্থিরতাও প্রভাব ফেলেছে
পরবর্তী সময়ে রেংমিটচা ভাষাভাষীরা নিজেদের মধ্যে আবার বসতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ক্রাংসিপাড়াসহ কয়েকটি ছোট পাড়া গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিস্থিতিতে পাহাড়ের বিভিন্ন ছোট পাড়া আবারও উচ্ছেদের মুখে পড়ে। এসব এলাকার মানুষ পরে বড় ম্রো পাড়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন।
এর ফলে রেংমিটচা ভাষাভাষী পরিবারগুলো আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং পারিবারিক পর্যায়ে ভাষাটির ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে রেংমিটচা ভাষার পরিবর্তে ম্রো ভাষাই তাঁদের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
গবেষণাতেও মিলেছে একই চিত্র
আফসানা ফেরদৌসের গবেষণাতেও রেংমিটচা ভাষার বিলুপ্তির পেছনে একই ধরনের ইতিহাস উঠে এসেছে।
তিনি জানান, রেংমিটচা ও ম্রো ভাষায় গুটিবসন্তকে ‘রিনা’ বলা হয়। মহামারির কারণে বিপুলসংখ্যক রেংমিটচা ভাষাভাষী মানুষের মৃত্যু এবং তাঁদের বসতি উচ্ছেদের ফলে ভাষাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গবেষণায় তিনি ১২টি ম্রো পাড়ায় ২৪টি পরিবার খুঁজে পেয়েছেন, যাদের পূর্বপুরুষেরা রেংমিটচা ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের সবাই এখন ম্রো ভাষায় কথা বলেন।
বাঁচানোর শেষ সুযোগ এখনই
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, রেংমিটচা এখন শুধু একটি ভাষা নয়, একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। ভাষাটির সাবলীল বক্তা যখন মাত্র দুজন, তখন সংরক্ষণের কাজ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।
প্রথম ধাপে জীবিত বক্তাদের কাছ থেকে ভাষাটির শব্দ, বাক্য, গল্প, লোককথা, গান ও দৈনন্দিন কথোপকথন রেকর্ড করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি লিখিত রূপ বা ব্যবহারযোগ্য লিপি তৈরি, শব্দভান্ডার ও ব্যাকরণ সংরক্ষণ এবং শিশু-কিশোরদের ভাষাটি শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
পারিবারিক জীবনে রেংমিটচা ভাষার ব্যবহার ফিরিয়ে আনা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাটির পুনঃচর্চার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিলুপ্তির পথে থাকা ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদাহরণ রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রেংমিটচাকেও টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
সাবলীল বক্তাদের সংখ্যা যখন মাত্র দুজনে নেমে এসেছে, তখন রেংমিটচা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই কার্যত শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া না হলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই ভাষাটি জীবন্ত কথ্য ভাষা হিসেবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একটি মন্তব্য করুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি * দিয়ে চিহ্নিত