বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ঋণ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণ ও ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আয়োজিত ২৩তম নুরুল মতিন মেমোরিয়াল লেকচারে ‘ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা’ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ খেলাপি ঋণের এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমের অন্যতম ভিত্তি হলো ঋণের অর্থ অর্থনীতিতে বারবার ঘুরে বিনিয়োগ হওয়া। ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে ঋণ দেয় এবং সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ ফেরত এলে তা আবার নতুন ঋণ হিসেবে অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়।
তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ঋণ আদায় ও পুনঃবিনিয়োগের এই চক্র ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর প্রভাব ব্যাংকের মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা এবং নতুন ঋণ বিতরণের ওপর পড়ছে বলেও জানান তিনি।
ড. মাহবুব উল্লাহ আরও বলেন, দীর্ঘদিনের লোকসান ও খেলাপি ঋণের কারণে কিছু ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে সমস্যায় পড়ছে। ফলে এসব ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তারাও ঝুঁকি কমাতে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
এর ফলে যোগ্য উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরী মূলধন এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে সমস্যায় পড়তে পারে। এর প্রভাব উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার উঠে এসেছে। জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়ায়, যা মার্চের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিআইবিএম গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোস্তাকুর রহমান ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের শক্তি শুধু মূলধন, প্রযুক্তি বা তারল্যের ওপর নির্ভর করে না। আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা, বিনিয়োগকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির মানুষের আস্থাও ব্যাংকিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামও ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতার চর্চার ওপর গুরুত্ব দেন। ঋণ অনুমোদন, পুনঃতফসিল, সম্পদের মূল্যায়ন, গ্রাহক নির্বাচন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
একটি মন্তব্য করুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি * দিয়ে চিহ্নিত