দুই দিন আগে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আনন্দে ভেসেছিল পাবনার বেড়া উপজেলার দুর্গম চর মিরপুর গ্রামের সোনালী আক্তারের পরিবার। পরীক্ষায় জিপিএ ৩ দশমিক ৫৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল সে। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই বিষধর সাপের কামড়ে প্রাণ গেল ওই কিশোরীর।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউনিয়নের দুর্গম চর মিরপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
সোনালী অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা মারা যাওয়ার পর মা মোছা. রাশেদা খাতুন (৪০) তাকে নিয়ে মামার বাড়িতে চলে আসেন। সেখানেই থেকে পড়াশোনা করছিল সোনালী।
এর আগে আরেক মেয়েকে হারিয়েছেন রাশেদা। ফলে সোনালীকে ঘিরেই ছিল তার সব স্বপ্ন। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি আর বিয়েও করেননি। মেয়েই হয়ে উঠেছিল তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সোনালীও মাকে আঁকড়ে ধরে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল।
বেড়ার সিনথী পাঠশালা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৩ দশমিক ৫৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় সোনালী। ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিন পরই থেমে গেল তার জীবনের পথচলা।
সাপের কামড়ের পর ওঝার বাড়িতে
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে মায়ের সঙ্গে পাশের একটি বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরছিল সোনালী। এ সময় তাকে একটি সাপ কামড় দেয়।
পরে তাকে হাসপাতালে না নিয়ে উপজেলার বাঁধেরহাট এলাকার এক ওঝার বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় ঝাড়ফুঁক চলার একপর্যায়ে সোনালী অচেতন হয়ে পড়ে।
এরপর তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথেই তার মৃত্যু হয়।
‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?’
একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ রাশেদা খাতুন। স্বজনদের কাছে বারবার বিলাপ করে তিনি শুধু বলছেন, ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?’
মেয়েকে ঘিরে দেখা সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে গেছে তাঁর। যে সন্তান ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বন, সেই সন্তানকেই হারিয়ে এখন শোকের সাগরে মা।
পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল পারদর্শী
সহপাঠী ও শিক্ষকেরা জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউটিং ও খেলাধুলায়ও পারদর্শী ছিল সোনালী। বিদ্যালয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করত সে। প্রাণবন্ত উপস্থিতির কারণে শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছেও খুবই প্রিয় ছিল সোনালী।
সিনথী পাঠশালার প্রধান শিক্ষক আরিফুল ইসলাম সজীব বলেন, এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয় ভালো ফল করায় আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ে আনন্দ অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে ফোনে সোনালীর সঙ্গে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল তাঁর। তখনও কে জানত, কয়েক ঘণ্টা পরই এমন মর্মান্তিক খবর শুনতে হবে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, সোনালী শুধু পড়াশোনায় ভালো ছিল না, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউটিং ও খেলাধুলাতেও তার আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল। তার এমন অকালমৃত্যুতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে শোকাহত।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *