বাজারে বড় ইলিশের সংকট থাকায় ভরা মৌসুমেও দাম আশানুরূপ কমছে না।
কেন বড় হচ্ছে না ইলিশ?
বরিশালের হিজলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমের ভাষ্য, একটি ইলিশের ১ থেকে দেড় কেজি ওজন অর্জন করতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে।
ইলিশের জীবনচক্র অনুযায়ী, নদীতে ডিম ফুটে জাটকা জন্ম নেওয়ার পর তা কিছু সময় মিঠাপানিতে বেড়ে সাগরে চলে যায়। সেখানে ধীরে ধীরে বড় হয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজন হলে প্রজননের জন্য আবার নদীতে ফিরে আসে। ডিম ছাড়ার পর আবার সাগরে গিয়ে পরিপক্ব হয়ে পরবর্তী সময়ে নদীতে ফিরে আসে।
কিন্তু এই দীর্ঘ জীবনচক্র শেষ হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক ইলিশ ধরা পড়ে যাচ্ছে। ফলে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
জাটকা নিধন ও নির্বিচার শিকার বড় সংকট
মৎস্য কর্মকর্তার মতে, নদীতে জাটকা ধরা, সাগরের মোহনায় ট্রলারের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ শিকার এবং নদী ও সাগরের মধ্যে ইলিশের চলাচলের পথে অতিরিক্ত মাছ ধরা—সব মিলিয়ে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর ফলে শুধু বড় আকারের ইলিশের সংখ্যা কমছে না, সামগ্রিক উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে দেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় মাছের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক জেলে নিষিদ্ধ সময়েও জীবিকার তাগিদে নদীতে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমানে নদীতে মাছ কমে গেলেও শত শত নৌকা ও জাল নিয়ে জেলেদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
প্রকৃত জেলেরা কি সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন?
মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা কমানো সম্ভব। তবে সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রমেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
তার দাবি, দীর্ঘ ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ না হওয়ায় অনেক প্রকৃত জেলে সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
হালনাগাদ তালিকা না থাকার কারণে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ প্রকৃত জেলে সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

কমছে ইলিশের উৎপাদন
বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক অর্থবছর ধরে বরিশাল বিভাগে ইলিশ উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০২০-২১: ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ টন
২০২১-২২: ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫১ টন
২০২২-২৩: ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন
২০২৩-২৪: ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টন
২০২৪-২৫: ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন
২০২৫-২৬: ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ১৫ টন
২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন উৎপাদনের পর ইলিশ উৎপাদন প্রতিবছরই কমেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ১৫ টনে।
অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৫ দশমিক ৮৫ টন, যা প্রায় ২৮ শতাংশ।
বড় ইলিশ ফেরাতে কী প্রয়োজন?
মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় ইলিশের সরবরাহ বাড়াতে হলে মাছকে পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। জাটকা নিধন বন্ধের পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের নদীতে না নামাতে হলে প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা তৈরি এবং যথাযথ সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। তা না হলে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য ছোট ইলিশ ধরার প্রবণতা চলতেই থাকবে, আর বাজারে বড় ইলিশের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ইলিশ শুধু বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় মাছই নয়, দেশের মৎস্য অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র রক্ষা এবং উৎপাদন ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *