দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, একাধিক মামলা এবং দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। দল ও সরকারের বিভিন্ন মহলে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানোর বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্তও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে এবং দলীয় প্রার্থী হিসেবে ফখরুলের নাম আলোচনায় এগিয়ে থাকার কথা জানানো হয়েছে।
এরই মধ্যে বিএনপির ভেতরে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন?
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পর গত শনিবার (৮ আগস্ট) মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে লিখিত সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। আগামী বুধবার (১২ আগস্ট) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয়ভাবে তার নাম ঘোষণা করা হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিলে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী তিনি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়েছেন।
মহাসচিব থেকে রাষ্ট্রপতি?
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে দলকে সংগঠিত রাখতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে রাজপথের আন্দোলন, মামলা-মোকদ্দমা এবং সাংগঠনিক চাপ সামলেছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দলের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুল ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ।
দলের তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি সমন্বয়েও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল।
এখন তাকে রাষ্ট্রপতি করার আলোচনা সামনে আসায় দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দল ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এবং তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য একজন নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানোর মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোয়ও ভারসাম্য তৈরি করতে চাইতে পারে।
তবে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনাতেও তাঁর নাম এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির ওপর নির্ভর করছে।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে মহাসচিব কে?
মির্জা ফখরুল শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হলে এবং নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়তে হবে তাকে। ফলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অন্তত তিনজনের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও মাঠের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকটের সময় নয়াপল্টনে দলীয় কর্মসূচি পরিচালনা এবং নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ের কারণে তৃণমূলের কাছে তাঁর শক্ত অবস্থান রয়েছে।
তবে একটি ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব হিসেবে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব সামলানোর সক্ষমতা নিয়েও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরার পর দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর গুরুত্ব বেড়েছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে মহাসচিব পদে তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক দক্ষতা দীর্ঘদিন ধরে দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
আন্দোলনের সময় সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
দলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয়ভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হলে মহাসচিব হিসেবে তাঁর নামও গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে এসব নাম নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব পদে মনোনীত করা হয়নি। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে যাচ্ছেন কি না, তার ওপরও পরবর্তী মহাসচিবের সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করবে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি
মির্জা ফখরুল শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হলে এবং নির্বাচিত হলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হবে। ফলে আসনটি শূন্য হলে সেখানে উপনির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও মির্জা ফখরুল বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।
ফলে তিনি রাষ্ট্রপতি হলে উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।
মির্জা পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরিবারের কাউকে প্রার্থী করার পক্ষে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ রয়েছে। অন্যদিকেে দলের তৃণমূলের আরেকটি অংশ আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা জেলা পর্যায়ের তরুণ ও পরীক্ষিত নেতাদের সুযোগ দেওয়ার দাবি তুলতে পারে।
তবে উপনির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টিও নির্ভর করবে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়া চূড়ান্ত হয় কি না এবং শেষ পর্যন্ত আসনটি শূন্য হয় কি না, তার ওপর।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তা বিএনপির জন্য একই সঙ্গে গর্বের মুহূর্ত এবং বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সব মহলে গ্রহণযোগ্য, ধীরস্থির ও ধৈর্যশীল নেতা হিসেবে ফখরুলের যে জায়গা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা নতুন মহাসচিবের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
দলের বিভিন্ন পক্ষ ও উপদলের মধ্যে যে ভারসাম্য তিনি এতদিন ধরে রেখেছেন, নতুন নেতৃত্বকে সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এদিকে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত বিএনপির সামনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে—এমন দাবিও প্রতিবেদনে রয়েছে। তবে এ দাবির বিষয়ে প্রকাশের আগে দলীয় বা জোটের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। এলডিপির সভাপতি হিসেবে অলি আহমদের পরিচয় নির্বাচন কমিশনের তথ্যেও নিশ্চিত করা যায়।
আগামী দিনে জোটের শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে দলের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বকীয়তা ধরে রাখা নতুন মহাসচিবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতার শীর্ষে এবং ফখরুল সাংবিধানিক কাঠামোর শীর্ষ পদে থাকবেন। এতে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির অবস্থান আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
দুজনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে—এমন মূল্যায়নও রয়েছে।
সব মিলিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে শুধু মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্নই নয়; বরং তিনি সত্যিই বঙ্গভবনে গেলে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন, সেটিও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপি মনোনয়ন দিলে সেটি যথাযথ মূল্যায়ন হবে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক গোলাম হাফেজ।
তিনি প্রতিদিব নাংলাকে বলেন, ফখরুল দলের দুঃসময়ে পাশে থেকে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তবে কাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তের দায়িত্ব বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *