দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র ছিল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সমর্থন সেই সম্পর্কেরই প্রতিফলন।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। আগামী ১২ জানুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় ভারতের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সেই বাস্তবতায় বিএনপি ছাড়া কার্যত ভারতের সামনে আর কোনো বড় রাজনৈতিক বিকল্প নেই।
এই প্রেক্ষাপটেই বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তারেক রহমানকে পাঠানো ওই চিঠিতে মোদি শুধু শোকই জানাননি, বরং বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন এবং ভারত–বাংলাদেশ অংশীদারত্বে খালেদা জিয়ার আদর্শকে ‘আলোকবর্তিকা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কূটনৈতিক ভাষায় এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতের কাছে বিএনপিই এখন ‘নম্বর ওয়ান অপশন’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদের মতে, ভারতের কূটনৈতিক হিসাব খুব বাস্তববাদী। তিনি বলেন, “ভারত বুঝতে পারছে, আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে। ফলে আগেভাগেই সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে। এখন ভারতের হাতে বিএনপি ছাড়া কার্যত আর কোনো অপশন নেই।”
এই বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের ঢাকা সফর, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগে।
তারেক রহমানের জনপ্রিয়তায় ভারতের নজর
১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং রাজধানীতে তাঁর গণসংবর্ধনায় লাখো মানুষের উপস্থিতি ভারতের কূটনৈতিক মহলেও আলোড়ন তোলে। ভারতের সাবেক কূটনীতিকেরা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশ বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও অস্থির বাংলাদেশে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন মধ্যপন্থী শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তও মনে করেন, তারেক রহমান বর্তমানে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে “সব সঠিক বার্তাই দিচ্ছেন” এবং তাঁর জনসমর্থন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সম্পর্ক গড়তে ভারতের সক্রিয়তা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বৈঠক ছিল এই প্রক্রিয়ার সূচনা। এরপর একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, শোকবার্তা ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ সম্পর্ক উষ্ণ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে সতর্ক বিএনপি
ভারতের আগ্রহ বাড়লেও বিএনপি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, বিএনপির কূটনীতির মূলনীতি—“সবার আগে বাংলাদেশ।” তিনি পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করার অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–বিএনপি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই পারস্পরিক আস্থা ও স্বার্থের সমন্বয়ের ওপর। তবে এটুকু পরিষ্কার—দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত এখন আর বিএনপিকে উপেক্ষা করার অবস্থানে নেই।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *