প্রতিদিন বাংলা - সত্য প্রকাশে সর্বদা পাশে

Header
collapse
...
হোম / রাজনীতি / নির্বাচনে ‘ডিপফেক–চিপফেক’ আতঙ্ক: ভোটার বিভ্রান্তিতে ১০ কৌশলের ভয়ংকর বিস্তার

নির্বাচনে ‘ডিপফেক–চিপফেক’ আতঙ্ক: ভোটার বিভ্রান্তিতে ১০ কৌশলের ভয়ংকর বিস্তার

জানু 11, 2026  Pratidin Bangla  170 views
নির্বাচনে ‘ডিপফেক–চিপফেক’ আতঙ্ক: ভোটার বিভ্রান্তিতে ১০ কৌশলের ভয়ংকর বিস্তার

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফল আগেই অনুমেয় ছিল। তবে ওই নির্বাচন ঘিরে ডিপফেক ব্যবহারের একটি ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। ভোট গ্রহণের দিন সকালে গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের একটি ভুয়া ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে দেখা যায়। পরে সেটি ডিপফেক প্রমাণিত হলেও ততক্ষণে বহু ভোটার বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

এটি বাংলাদেশে নির্বাচনী ডিপফেকের একটি বাস্তব উদাহরণ মাত্র। জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের (KAS) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তাইওয়ান ও ফ্রান্সসহ বহু দেশে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডিপফেক ও অপতথ্যের ব্যবহার বেড়েছে।

ডিপফেক ও চিপফেক কী

ডিপফেক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি এমন ভুয়া ভিডিও, অডিও বা ছবি, যা দেখতে একেবারে আসলের মতো। অন্যদিকে চিপফেক এআই নয়, তুলনামূলক সস্তা সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি করা হয়—যেখানে সত্য কনটেন্টকে বিকৃত বা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো।

দেশে ব্যবহৃত ১০টি প্রধান অপতথ্য কৌশল

ফ্যাক্টচেকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশলগুলো হলো—

  • সত্য ভিডিও বা ছবির সঙ্গে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া
  • বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে প্রসঙ্গ বদলে দেওয়া
  • মনগড়া বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালানো
  • পুরোনো ভিডিও বা ছবি নতুন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন
  • ডিপফেক ভিডিওতে প্রার্থীর কণ্ঠ ও মুখ ব্যবহার
  • সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড বা টিভি স্ক্রলের নকল গ্রাফিকস
  • ভুয়া পরিসংখ্যান ও সংখ্যা ব্যবহার
  • স্ক্রিনশট ও নথি জাল করা
  • একই মিথ্যা তথ্য একযোগে বহু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো
  • ভুয়া ফেসবুক পেজ ও বটবাহিনী দিয়ে সমন্বিত অপপ্রচার

ভিডিওই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে ছড়ানো ভুয়া তথ্যের ৬৬ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। আগের তিন মাসের তুলনায় লেখা ও ছবির ব্যবহার কমেছে। অর্থাৎ, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওভিত্তিক বিভ্রান্তিও তত বাড়ছে।

রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫৬টিই ছিল রাজনৈতিক। ভিডিওভিত্তিক অপতথ্য ছিল সর্বাধিক—৬৫১টি।

কারা করছে এই অপপ্রচার

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপতথ্যের পেছনে দুটি প্রধান গোষ্ঠী কাজ করছে।
একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে উদ্বুদ্ধ।
অন্য গোষ্ঠী অর্থের বিনিময়ে অপতথ্য তৈরি ও ছড়ায়।

ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, অপতথ্য ছড়ানো অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা সহজ হলেও এর নেপথ্যের সংগঠকদের বের করতে তদন্ত দরকার, যা ফ্যাক্টচেকারদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ভুয়া পরিচয়ে খোলা ফেসবুক পেজ ও ‘বটবাহিনী’ রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ হয়ে কাজ করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গ্রুপ তৈরি করে সংঘবদ্ধভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছেন।

সরকার কী করছে

অপতথ্যের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে। নির্বাচন কমিশন, প্রেস উইং, পিআইবি, বাসস, বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ চলছে। পুলিশের সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার ২৪ ঘণ্টা নজরদারির কথা জানিয়েছে।

কিন্তু ঝুঁকি কমছে না কেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা হলো অপতথ্য খুব দ্রুত ছড়ায়, কিন্তু তা যাচাই ও অপসারণে সময় লাগে। এর মধ্যেই মানুষ সেটিকে সত্য ধরে নেয়। এমনকি রাজনৈতিক নেতা ও কিছু সংবাদমাধ্যমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া কনটেন্টকে যাচাই ছাড়াই প্রচার করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন সতর্ক করে বলেন, ডিপফেক ও সাইবার আক্রমণের কারণে বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পেছানোর উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশেও ঝুঁকি স্বীকার করা হলেও কার্যকর প্রতিরোধ এখনো যথেষ্ট নয়।


Share:

ট্যাগস: রাজনীতি

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *