আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ঘিরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের শীর্ষ পর্যায়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানালেও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্যের বক্তব্য এবং প্রকাশিত রেজুলেশন অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী কেউ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য নতুন করে আবেদন করতে পারবেন না। তবে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালিকাভুক্ত হতে পারলে বয়সের কারণে বাধার মুখে পড়তে হবে না বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
যেভাবে সামনে এলো বয়সসীমার বিষয়টি
আইনজীবী পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বেশ কয়েক বছর আগে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চে মামলার শুনানির সময় বিষয়টি আলোচনায় আসে। তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আইনজীবী হওয়ার সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তবে বিষয়টি দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরে ছিল।
চলতি বছরের ১৯ আগস্ট বার কাউন্সিলের সভায় আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা শুরু হয় ১৩ অক্টোবর, যখন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সিদ্ধান্তটির কথা জানান।
কেন বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আইন পেশায় দক্ষ ও মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করা, পেশার মান ও মর্যাদা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাঁর মতে, বিভিন্ন পেশা থেকে অবসর নেওয়া বা অন্য কারণে কর্মজীবন পরিবর্তন করা অনেকেই তুলনামূলক বেশি বয়সে আইন পেশায় প্রবেশ করছেন। তাঁদের মধ্যে কারও কারও বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইন অঙ্গনে অননুমোদিত মধ্যস্থতাকারী বা ‘টাউট’ শ্রেণির তৎপরতা কমানোর বিষয়টিও সিদ্ধান্তের পেছনে বিবেচনায় এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য, আধুনিক ও দক্ষ আইনজীবী তৈরির পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পেশার প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা দূর করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
রেজুলেশনে কী বলা হয়েছে
অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের সামনে যে রেজুলেশন উপস্থাপন করেন, তাতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল-২৫৩/২০১৪ মামলার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হয়েছে।
রেজুলেশন অনুযায়ী, বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করে। আইন পেশার মর্যাদা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং পেশাকে গতিশীল রাখার যুক্তিতে গত ৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় ৩৫ বছর বয়সসীমার প্রস্তাব করা হয়।
পরে বিষয়টি বার কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করা হলে উপস্থিত সদস্যরা এ বিষয়ে একমত হন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে রেজুলেশনে উল্লেখ রয়েছে। সিদ্ধান্তটি ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার কথাও এতে বলা হয়েছে।
ভাইস চেয়ারম্যানের বক্তব্যে তৈরি হয় ধোঁয়াশা
সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসার পরদিন বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন ভিন্ন বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, সারা দেশের আইনজীবীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে যে ধরনের বর্ধিত সভা বা প্রতিনিধি সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেখানে ৩৫ বছর বয়সসীমা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য এবং অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে পদাধিকারবলে দায়িত্ব পালনকারী চেয়ারম্যানের ভূমিকা আলাদা। আইনমন্ত্রী কোনো বক্তব্য দিয়ে থাকলে সেটি সরকারের পক্ষের বক্তব্য হতে পারে; তবে তাঁর দাবি অনুযায়ী, বার কাউন্সিল এমন কোনো সিদ্ধান্ত তখনও নেয়নি।
এ বক্তব্যের পর সিদ্ধান্তটির সত্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে নথিপত্রসহ সিদ্ধান্তের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ নিয়ে সংশয় থাকলে বার কাউন্সিলের অন্য সদস্যদের বক্তব্যও নেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিদ্ধান্ত বহাল থাকার পক্ষে আরেক সদস্যের বক্তব্য
বার কাউন্সিলের রোল অ্যান্ড পাবলিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরও সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে বলে জানান। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করার সময় প্রার্থীর বয়স সর্বোচ্চ ৩৫ বছর হতে হবে। বয়সসীমা অতিক্রম করলে নতুন করে আবেদন করা যাবে না।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটি ২০৩০ সাল থেকে কার্যকর হবে এবং এ-সংক্রান্ত রেজুলেশনে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের স্বাক্ষর রয়েছে। ফলে তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।
সব মিলিয়ে, আইনজীবী পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বার কাউন্সিলের শীর্ষ পর্যায়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে রেজুলেশন ও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ভাইস চেয়ারম্যান তা অস্বীকার করছেন। ফলে সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন ও আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *