বিদ্যুতের উচ্চমূল্য ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে উৎপাদন ব্যয় কমাতে শিল্পকারখানাগুলোতে বাড়ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। বিশেষ করে বড় ও রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলো গত কয়েক বছরে কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার তুলনায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ অনেক কম। শিল্পে গ্রিডের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম সাধারণত ১২ থেকে ১৩ টাকা। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে তা প্রায় ১৬ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। বিপরীতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ হচ্ছে প্রায় ৪ থেকে ৮ টাকা।
ফলে বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে সৌরবিদ্যুতে আগ্রহী হচ্ছেন শিল্প মালিকেরা।
দুই বছরে বড় অগ্রগতি
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ইতোমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে। এর বড় অংশই তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। তবে তাদের হিসাবে ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদেই প্রায় ৬৬৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে।
ছোট স্থাপনাগুলোও হিসাবের আওতায় এলে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমেছে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যয়ও আগের তুলনায় কমেছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পাঁচ বছর আগে ছাদে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রায় ৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। বর্তমানে একই সক্ষমতার প্ল্যান্ট স্থাপনে খরচ নেমে এসেছে প্রায় ৪ কোটি টাকায়।
অন্যদিকে জমিতে এক মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮ কোটি টাকা। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সৌর প্যানেলসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির দাম কমে যাওয়ায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এখন শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ
বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
ডিবিএল গ্রুপের সাতটি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে সিরামিক ও তৈরি পোশাকসহ ১০টি কারখানায় আরও ১৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপও তাদের সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। তাদের কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা খরচ হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন কারখানায় ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এর মধ্যে ২০টি কারখানায় প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। চলতি বছর আরও প্রায় ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুটি কারখানা থেকে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
আকিজ বশির গ্রুপের জনতা জুট মিলে ২১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে, যা মিলটির পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করছে। হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের কারখানায় ১৩ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সিস্টেমের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে রাতে সংরক্ষিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এতে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। আরও ৫০ মেগাওয়াট স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তাদের মোট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে।
দিনে গ্রিডের ওপর চাপ কমাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ
শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আরেকটি সুবিধা হলো দিনের ব্যস্ত সময়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো। সাধারণত কোনো কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা যায়। তবে কিছু কারখানায় এ হার আরও বেশি।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার জানিয়েছে, ২০২১ সাল থেকে তারা প্রায় ১০০টি শিল্পকারখানার ছাদে ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে। বর্তমানে আরও ১২টি শিল্পকারখানায় কাজ চলছে। এসব প্রকল্প চালু হলে আরও প্রায় ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।
ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায় এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বড় ধরনের পরিচালন ব্যয় নেই। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
অর্থায়ন এখনো বড় বাধা
সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করাকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
বিজিএমইএর ৪২৪টি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে মালিকেরা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৫ শতাংশ এবং ইডকল থেকে ৬ শতাংশ সুদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ইডকলের ঋণের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টির প্রয়োজন হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তার জন্য অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, ঋণের সুদ আরও কমানো কিংবা পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলে মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।
পোশাক খাতে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা
সিপিডির এক সমীক্ষায় দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারখানায় দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব বলেও সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়বে। এতে একদিকে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ।
একটি মন্তব্য করুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি * দিয়ে চিহ্নিত