দুর্গাপূজা, প্রবারণা পূর্ণিমা ও টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। সৈকতের বালুচর থেকে শুরু করে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউজ—সবখানেই বেড়েছে মানুষের উপস্থিতি। পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশা, ১০ দিনের ছুটিতে প্রায় ১৫ লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।
বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। একই চিত্র হিমছড়ি, ইনানী ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও। বিশেষ করে শহরের হোটেল, গেস্টহাউজ ও কটেজগুলোতে অতিথিদের চাপ বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
গত কয়েক দিন ধরেই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছিল। তবে মঙ্গলবার থেকে সেই চাপ আরও বেড়েছে। সম্প্রতি ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় পর্যটকদের আগমন নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে বলে দাবি হোটেলমালিকদের।
অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ আগাম বুকিং
কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানিয়েছেন, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলে প্রায় সব কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। মাঝারি মানের হোটেল, গেস্টহাউজ ও কটেজের প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষও বুকিং রয়েছে।
তাঁর প্রত্যাশা, দুর্গাপূজার ছুটি, সাপ্তাহিক ছুটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি মিলিয়ে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা ১০ দিনের ছুটিতে কক্সবাজারে অন্তত ১৫ লাখ পর্যটক আসতে পারেন। এর মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন উৎসবকে কেন্দ্র করে তিন দিনেই প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সমাগমের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিনি জানান, কক্সবাজার শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউজে একসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।
হোটেল কক্স টুডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব বলেন, তাঁদের হোটেলের সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। অক্টোবরজুড়েই অতিথিদের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে তাঁরা আশা করছেন।
হাজার কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা
পর্যটকের এই বাড়তি উপস্থিতিকে ঘিরে আশাবাদী স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুরের প্রত্যাশা, ১০ দিনের ছুটিতে ১৫ লাখ পর্যটক এলে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।
পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে আবাসন ও খাবারের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন, পর্যটনসেবা এবং বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ব্যবসাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই অঙ্ক ব্যবসায়ীদের পূর্বাভাস; প্রকৃত লেনদেনের হিসাব ছুটি শেষে পাওয়া যেতে পারে।
কক্ষভাড়ায় ছাড় নেই, নজরদারিতে প্রশাসন
পর্যটকের চাপ বাড়লেও এবার হোটেলকক্ষের ভাড়ায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন হোটেলমালিক সমিতির সভাপতি। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও পর্যটকদের হয়রানি ঠেকাতে প্রশাসনের তদারকি রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিমা বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের সেবা নিশ্চিত করা ও হয়রানি বন্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করছে।
প্রতিমা বিসর্জনে সম্প্রীতির মিলনমেলা
দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে কক্সবাজার সৈকতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে অংশ নেন। ফলে ধর্মীয় আয়োজনটি পরিণত হয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মিলনমেলায়।
পরিবার নিয়ে সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অনেকে ভিড়ের কারণে এক পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে গেছেন। আবার অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে কক্সবাজারে এসেছেন।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু জানান, প্রশাসনের সহযোগিতায় বড় আয়োজনটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা কক্সবাজারে এসে প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য অটুট রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে আয়োজন
এবার কক্সবাজার জেলায় মোট ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজার আয়োজন ছিল।
উপজেলা ও পৌরসভাভিত্তিক হিসাবে চকরিয়ায় সবচেয়ে বেশি ৭১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি এবং টেকনাফে ৬টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়।
পাঁচ দিনের পূজা শেষে বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। ভক্তদের প্রত্যাশা, অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন দেবী দুর্গা।
এদিকে, টানা ছুটিতে পর্যটকের এই ব্যাপক উপস্থিতি কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায় নতুন গতি সঞ্চার করেছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পর্যটকদের নিরাপত্তা, মানসম্মত সেবা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের পর্যটন অর্থনীতিতে এ ধরনের ছুটি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একটি মন্তব্য করুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি * দিয়ে চিহ্নিত