মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ৩৪ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বা ১ ডলার ২৯ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ১১ সেন্টে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১ শতাংশ বা ৯৭ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলার ১২ সেন্টে পৌঁছায়।
এর আগের দিন বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ৮২ সেন্ট এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ছিল ৯৭ ডলার ১৫ সেন্ট।
সৌদির বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্র ঘিরে উদ্বেগ
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলো জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বুধবার দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় একজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
একই দিনে সৌদি আরামকোর শায়বাহ তেলক্ষেত্রের কাছে প্রতিহত করা একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুই বিদেশি কর্মী নিহত হন এবং আরও দুজন আহত হন বলে জানানো হয়েছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তেলক্ষেত্রটিকে লক্ষ্য করে ড্রোনটি পাঠানো হলেও এ ঘটনার কারণে তেলক্ষেত্রের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি।
তবে জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহনপথে হামলার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও অস্থির হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
জাহাজ চলাচলে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জাহাজে অন্তত ১৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, সামুদ্রিক নিরাপত্তাঝুঁকি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হলে তেল পরিবহন ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রমেও বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাও প্রভাব ফেলছে বাজারে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তাঁর দেশ আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মন্তব্য করেন, অবরোধ ও সামরিক হুমকি অব্যাহত রেখে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার প্রত্যাশা করতে পারে না।
এ ধরনের বক্তব্য ও সামরিক উত্তেজনা তেল উৎপাদন, পরিবহন এবং সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমায় দামে সমর্থন
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল কমে ৪১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা মজুত ৮ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। বাস্তবে মজুত কমেছে পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে ডিজেল ও হিটিং অয়েলসহ ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত উল্টো ১৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল বেড়ে ১০ কোটি ৪৩ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্লেষকেরা মজুত কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
শীতের আগে জ্বালানি সরবরাহের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের
জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন নর্থইস্ট হোম হিটিং অয়েল রিজার্ভ থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৫ হাজার ব্যারেল জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাময়িক বিনিময় ব্যবস্থায় যেসব কোম্পানি এই জ্বালানি নেবে, তাদের অতিরিক্ত পরিমাণসহ তা ফেরত দিতে হবে। শীত মৌসুমের আগে জ্বালানির ঘাটতি মোকাবিলা এবং বাড়িঘর গরম রাখার ব্যয় কমানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধির চাপ আরও জোরালো হয়েছে। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কোন দিকে যায়।
একটি মন্তব্য করুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি * দিয়ে চিহ্নিত